পরিবেশ দূষণ এড়াতে ‘সবুজ কংক্রিট’

0

স্কাইনিউজ প্রতিবেদক: সিমেন্ট আর পানি ছাড়া কংক্রিটে যা কিছু থাকে, পরিভাষায় তার নাম ‘অ্যাগ্রেগেট’৷ কিন্তু সেই অ্যাগ্রেগেটে যদি পুরনো ইনডাস্ট্রিয়াল ফাইবার, এমনকি পুরনো টায়ার বা প্লাস্টিকের টুকরো ঢোকানো থাকে, তাহলে তার নাম হয় ‘সবুজ কংক্রিট৷’

কংক্রিট বস্তুটি সবসময় আমাদের চারপাশেই রয়েছে, অথচ অদৃশ্য৷ সিমেন্ট, বালি বা নুড়ি আর পানি মিশিয়ে যে কংক্রিট তৈরি হয়, এ আমরা সকলেই জানি৷ শহরের বড় বড় বাড়িঘরের অস্থিমজ্জা হল এই কংক্রিট৷

সালের্নো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা আপাতত একটি ইউরোপীয় গবেষণা প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত, যার উপজীব্য হল কংক্রিট৷ সাধারণ কংক্রিটের উপাদান হল পানি, সিমেন্ট আর বালি, নুড়ি ইত্যাদি – বিজ্ঞানীরা তার সঙ্গে যোগ করেছেন ‘রিসাইকল্ড ইনডাস্ট্রিয়াল ফাইবার’ বা শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত নানা ধরনের আঁশ বা তন্তু৷

উদ্দেশ্য: আরো বেশি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কংক্রিট তৈরি করা৷

সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এনজো মার্তিনেলি জানালেন, ‘‘আমরা দেখার চেষ্টা করছি, কংক্রিটে সাধারণ  ইনডাস্ট্রিয়াল ফাইবারের পরিমাণ কমিয়ে তার বদলে কীভাবেপুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্পোপযোগী তন্তু ব্যবহার করা যায় – এবং কংক্রিটের মান ও স্থিতিস্থাপকতার হানি না ঘটিয়ে তা করার চেষ্টা চলছে৷”

রিসাইকল্ড পদার্থে সমৃদ্ধ এই পরীক্ষামূলক কংক্রিট বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করা হয়: বেঁকিয়ে, চাপ দিয়ে, টেনে লম্বা করে ও চিরে দেখা হয়, চরম পরিস্থিতিতে ঐ কংক্রিটের কী প্রতিক্রিয়া হয়৷ আর্জেন্টিনার ইঞ্জিনিয়ার আন্তোনিও কাজিয়ানো সেজন্য সব ধরনের স্ট্রেস টেস্টের ব্যবস্থা করেছেন৷

সিভিল ইঞ্জিনিয়ার আন্তোনিও কাজিয়ানো যোগ করলেন, ‘‘আমরা বুঝেছি যে, রিসাইকল্ড ইনডাস্ট্রিয়াল ফাইবারের মূল সমস্যা হল তার জ্যামিতি৷ অন্য নানা কাজে ব্যবহৃত হওয়ার ফলে তাদের জ্যামিতি আর নিয়মমাফিক বা মসৃণ নয়৷ কাজেই সেগুলি সিমেন্টের সাথে ভালোভাবে মেশে না৷”

কাজিয়ানো আরো বললেন, ‘‘নতুন ইনডাস্ট্রিয়াল ফাইবার আরো ভালোভাবে মেশে৷ যার অর্থ, আমরা এমন একটা কংক্রিট তৈরি করতে পারি যার যান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি আরো বেশি সমজাতীয়, এবং সেই কারণে আরো বেশি নির্ভরযোগ্য৷”

কংক্রিটের ভিতরে কী ঘটে

যান্ত্রিক পরীক্ষা ছাড়াও গবেষকরা কম্পিউটার সিমিউলেশনের মাধ্যমে দেখার চেষ্টা করেন, চরম পরিস্থিতিতে কংক্রিটের ভিতরে কী ঘটে৷ তুকুমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হোসে গিয়ের্মো এৎসে বোঝালেন, ‘‘একাধিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে: যেমন কংক্রিটের ভিতরে প্রতিটি উপাদানের অনমনীয়তা, কংক্রিটের ভিতরকার আকার, রসায়ন, অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা, আর্দ্রতার পরিমাণ, কংক্রিটে কতটা ফাইবার আছে ও কী ধরনের ফাইবার – এই সব প্যারামিটার দিয়ে আমরা কংক্রিটের প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করি৷”

বিজ্ঞানীদের আশা যে, তাঁদের গবেষণার ফলে শীঘ্রই কলকারখানায় ‘সবুজ কংক্রিট’ তৈরি হবে – যেমন এই কারখানাটি, যেখানে প্রতি বছর ষাট হাজার ঘনমিটার কংক্রিট তৈরি হয়৷ কোম্পানির ম্যানেজাররা বলছেন, তারা টেকসই, বিকল্প কংক্রিট উৎপাদন করতে রাজি – তবে একটি শর্তে৷

কংক্রিট তৈরির কোম্পানির কোয়ালিটি ম্যানেজার মাউরো মেলে বললেন, ‘‘আমরা ইতিমধ্যেই আমাদের কংক্রিটে শতকরা ১০০ ভাগ রিসাইকল্ড পানি ব্যবহার করি৷ আমরা খুব খুশি হয়ে রিসাইকল্ড ফাইবারের মতো পুনর্ব্যবহারযোগ্য ‘অ্যাগ্রেগেট’ ব্যবহার করব, যদি তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের উপযোগী হয়৷”

সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এনজো মার্তিনেলি আরেকটি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করলেন: ‘‘উদ্ভিদ তন্তু দিয়ে সমৃদ্ধকৃত সবুজ কংক্রিট পুরনো বাড়িঘর মজবুত করার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে – যেমন ঐতিহাসিক বাড়িঘর৷ ওটা একটা ভালো, টেকসই বিকল্প, কেননা ওটা এমন সব পদার্থ থেকে তৈরি, পরিবেশের উপর যাদের প্রভাব অনেক কম ও পরিবর্তনীয়৷ যেহেতু ঐ কংক্রিট বাড়ির কাঠামো তৈরির কাজে ব্যবহার হচ্ছে না, কাজেই প্রযোজনে অন্য কংক্রিট দিয়ে তা পালটে দেওয়া যাবে৷”

পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্পোপযোগীতন্তু ও উদ্ভিদজাত তন্তু ছাড়াও বিজ্ঞানীরা আগামীতে পুরনো গাড়ির টায়ার ও পুরনো প্লাস্টিক ব্যবহার করে উচ্চমানের সবুজ কংক্রিট তৈরির আশা রাখেন৷

LEAVE A REPLY

5 × four =